ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযুক্তের আইনজীবী পাওয়ার অধিকার
নিজস্ব প্রতিবেদক
Update Time :
শনিবার, মে ২৩, ২০২৬,
40 Time View
Spread the love
বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, উপমহাদেশীয় বিচারব্যবস্থার নজির এবং ব্রিটিশ আইনি ঐতিহ্য
লেখক: মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে, “কেউ দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্দোষ।” এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ পান। আর আত্মপক্ষ সমর্থনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার।
কিন্তু বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, কোনো আলোচিত, স্পর্শকাতর কিংবা প্রভাবশালী মামলায় অভিযুক্তের পক্ষে স্থানীয় আইনজীবীরা দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করেন। কখনও সামাজিক চাপ, কখনও পেশাগত সম্পর্ক, আবার কখনও বারের অলিখিত সিদ্ধান্তের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তি কার্যত আইনগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নির্দেশনা
২০১৯ সালে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন। কিশোরগঞ্জে এক আইনজীবী কর্তৃক দায়েরকৃত চাঁদাবাজির মামলায় অভিযুক্তদের পক্ষে স্থানীয় কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। অভিযোগ ছিল, বাদী নিজে আইনজীবী হওয়ায় বারের প্রভাবের কারণে আসামিপক্ষ আইনজীবী পাচ্ছিল না। পরে অভিযুক্তরা হাইকোর্টে গেলে আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন।
হাইকোর্ট নির্দেশ দেন যে:
দেশের কোনো নিম্ন আদালতে কোনো বিচারপ্রার্থী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি আইনজীবী নিয়োগে ব্যর্থ হন, তবে সংশ্লিষ্ট বার সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তার পক্ষে আইনগত সহায়তা প্রদান করবেন।
একইসাথে আদালত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন মনিটর করার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতেও উচ্চ আদালত একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। নওগাঁ বার সমিতির এক ঘটনায় কোনো আইনজীবী অভিযুক্তের পক্ষে না দাঁড়ানোয় হাইকোর্ট বার সভাপতিকে ও সম্পাদককে তলব করেন।
সাংবিধানিক ভিত্তি
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির আইনজীবীর সহায়তা গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত। একইভাবে ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
যখন কোনো অভিযুক্ত আইনজীবী পান না, তখন বাস্তবে তিনি সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। আদালত তখন একতরফা বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ভবিষ্যতে রায় প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আইনজীবীর ভূমিকা অপরাধকে সমর্থন নয়
সমাজে অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি হয় যে, কোনো অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী দাঁড়ানো মানে তার অপরাধকে সমর্থন করা। বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
আইনজীবীর দায়িত্ব হচ্ছে:
আদালতের সামনে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা,
সাক্ষ্য ও তদন্তের বৈধতা যাচাই করা,
আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা,
এবং অভিযুক্তের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা।
বিচারব্যবস্থায় প্রসিকিউশন এবং ডিফেন্স উভয় পক্ষের বক্তব্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আদালতের কাজ কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; বরং সত্য উদঘাটন করা।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক অবস্থান
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন। বিখ্যাত মামলা A.S. Mohammed Rafi v. State of Tamil Nadu মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বলেন:
কোনো বার অ্যাসোসিয়েশন কোনো অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী দাঁড়ানো নিষিদ্ধ করতে পারে না।
আদালত আরও বলেন:
অভিযুক্ত ব্যক্তি সন্ত্রাসী, ধর্ষক বা খুনি যাই হোক না কেন, তার আইনজীবী পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে:
আইনজীবীর পেশাগত নৈতিকতা অভিযুক্তকে প্রতিরক্ষা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করে,
বার সমিতির কোনো সিদ্ধান্ত আইনজীবীর স্বাধীন পেশাগত দায়িত্বকে খর্ব করতে পারে না,
এবং অভিযুক্তকে আইনগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।
২০২৩ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট আরও কঠোর ভাষায় বলেন:
কোনো বার অ্যাসোসিয়েশন যদি অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী দাঁড়াতে বাধা দেয়, তবে তা আদালত অবমাননার সামিল হতে পারে।
পাকিস্তানি বিচারব্যবস্থার অভিজ্ঞতা
পাকিস্তানেও বহু সংবেদনশীল মামলায় অভিযুক্তরা আইনজীবী পেতে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে ধর্ম অবমাননা বা রাজনৈতিক সংবেদনশীল মামলায় আইনজীবীরা অনেক সময় নিরাপত্তা ও সামাজিক চাপে মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন।
তবে পাকিস্তানি আদালতও স্পষ্ট করেছেন যে, আইনগত প্রতিনিধিত্ব ন্যায্য বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাম্প্রতিক এক সন্ত্রাসবিরোধী আদালতের মামলায় আদালত মন্তব্য করেন:
অভিযুক্ত নিজে আইনজীবী নিয়োগ না করলে আদালত রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী দেবেন, কারণ আইনগত প্রতিনিধিত্ব ছাড়া বিচার চলতে পারে না।
এটি উপমহাদেশীয় বিচারব্যবস্থার একটি অভিন্ন নীতি প্রতিফলিত করে যে, “ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা আইনজীবী অপরিহার্য।”
ব্রিটিশ আইনি ঐতিহ্য ও “Cab Rank Rule”
বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থার শিকড় মূলত ব্রিটিশ কমন ল’-এ নিহিত। ব্রিটিশ আইনি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রচলিত রয়েছে, যাকে বলা হয় “Cab Rank Rule”।
এই নীতির অর্থ হলো:
একজন ব্যারিস্টার তার পেশাগত যোগ্যতার আওতায় কোনো মামলা এলে শুধুমাত্র মামলার প্রকৃতি, অভিযুক্তের পরিচয় বা জনরোষের কারণে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারবেন না।
এই নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে:
সবচেয়ে ঘৃণিত বা অজনপ্রিয় অভিযুক্তও যেন আইনি সহায়তা পান,
আদালতে প্রতিটি পক্ষের বক্তব্য উপস্থাপিত হয়,
এবং বিচারব্যবস্থা জনআবেগ নয়, আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
ব্রিটিশ আদালত বহুবার বলেছেন:
“Justice must not only be done, but must also be seen to be done.”
অর্থাৎ, বিচার কেবল হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং এমনভাবে হতে হবে যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে বিচারটি সত্যিই নিরপেক্ষ ও ন্যায্য হয়েছে।
আইনজীবীকে হয়রানি বা বাধা দেওয়া কেন বিপজ্জনক
ভারতের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, কোনো আইনজীবী কেবল একজন অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন বলে তাকে হয়রানি করা বা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা আইনের শাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ।
কারণ:
স্বাধীন আইনজীবী ছাড়া স্বাধীন বিচারব্যবস্থা সম্ভব নয়,
আইনজীবী ভয় পেলে অভিযুক্ত ন্যায্য প্রতিরক্ষা পাবেন না,
এবং শেষ পর্যন্ত পুরো বিচারব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের ২০১৯ সালের নির্দেশনা শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়; এটি ন্যায়বিচারের সাংবিধানিক দর্শনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট, পাকিস্তানি আদালত এবং ব্রিটিশ আইনি ঐতিহ্য একই বার্তা দেয়:
অভিযুক্ত যত ঘৃণিতই হোক, তার আইনজীবী পাওয়ার অধিকার আছে।
বার সমিতি বা সামাজিক চাপের কারণে এই অধিকার খর্ব করা যায় না।
আইনজীবীর কাজ অপরাধকে সমর্থন করা নয়; বরং আদালতকে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করা।
বিচারব্যবস্থার প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই যে, আদালত আবেগ দিয়ে নয়, আইন ও প্রমাণ দিয়ে বিচার করেন। আর সেই বিচারকে নির্ভুল ও প্রশ্নাতীত করতে একজন স্বাধীন ও নির্ভীক আইনজীবীর উপস্থিতি অপরিহার্য।