May 13, 2026, 11:45 am

মহান শ্রমিক দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : শুক্রবার, মে ১, ২০২৬,
  • 32 Time View
Spread the love

মে দিবসে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যখন সারা বিশ্বে আলোচনা হয়, তখন বাংলাদেশের একটি দ্রুতবর্ধনশীল শ্রমশক্তি প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। তাঁরা কারখানায় নয়, অফিসেও নয়; কাজ করেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। ফ্রিল্যান্সার, রাইড শেয়ার চালক, ফুড ডেলিভারি রাইডার কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েটর—এই জেন-জি প্রজন্ম বাস্তবে শ্রম দিলেও আইনের চোখে তাঁদের অবস্থান এখনো অনির্ধারিত। এই খাতের শ্রমজীবীরা প্রায় অভিন্ন বাক্যে বলছেন, আমরা কাজ করি, কিন্তু শ্রমিক না।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ফাইভারে কাজ করেন মো. ইমতিয়াজ হোসেন। তিনি বলেন, এটি স্বাধীন পেশা, সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই—ডিভাইস যেখানে, সেখানেই অফিস। কিন্তু বিদেশি ক্লায়েন্ট হওয়ায় প্রায়ই সারা রাত কাজ করতে হয়, পরদিন সকালেও আবার কাজে বসতে হয়। কিন্তু অসুস্থ হলে বা কাজ না থাকলে আয়ও বন্ধ।

তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতা এখন আরো কঠিন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অনেকের ছোটখাটো চাহিদা দ্রুত মিটে যাচ্ছে। ফলে টিকে থাকতে আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়েও এগিয়ে থাকতে হয়। তা না হলে কাজ হারানোর ঝুঁকি থাকে।

’ মিরপুরের ২২ বছর বয়সী গ্রাফিক ডিজাইনার রাফি (ছদ্মনাম) আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করি। ক্লায়েন্ট বিদেশে থাকায় রাত জেগে থাকতে হয়। আমরা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখলেও কোনো নীতিমালা নেই।’ মে দিবস শ্রমিকদের অধিকারের প্রতীক।

কিন্তু ডিজিটাল যুগে শ্রমের ধরন বদলে যাওয়ায় বাস্তবতাও বদলে গেছে। চট্টগ্রামের ইমতিয়াজ কিংবা ঢাকার রাফিরা অর্থনীতি সচল রাখলেও শ্রমিক হিসেবে তাঁদের স্বীকৃতি নেই, সুরক্ষাও সীমিত। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, ডিজিটাল অর্থনীতির এই অদৃশ্য শ্রমিকদের স্বীকৃতি না দিলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। আনুষ্ঠানিক শ্রম কাঠামোর বাইরে থাকায় এই বিশাল কর্মশক্তির জন্য নেই কোনো ন্যূনতম মজুরি বা সামাজিক সুরক্ষা। অথচ তাঁরা এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে শুরু করেছেন। আইসিটি এবং বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে আট লাখেরও বেশি সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে সাড়ে ছয় লাখের বেশি আপওয়ার্ক, ফাইভার ও ফ্রিল্যান্সার ডটকমের মতো প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত। এঁদের বড় অংশই তরুণ। আইসিটি বিভাগের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ফ্রিল্যান্সারের বয়স ৩৫ বছরের নিচে, যা বেকারত্ব কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট তরুণ ও প্রযুক্তিসচেতন ব্যক্তিদের আধিপত্য প্রমাণ করে। এদিকে ডিজিটাল শ্রম খাত এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে বছরে এক থেকে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আয় আসে, যা বাংলাদেশকে ভারতের পর দক্ষিণ এশিয়ায় অনলাইন শ্রমের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস পরিণত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রেমিট্যান্স আয়ের একটি অংশ এখন এই ডিজিটাল শ্রমিকদের হাত ধরেই আসছে। অথচ এই বিপুল অবদানের পরও তাঁদের জন্য নেই কোনো ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা পেনশন কাঠামো। ফলে অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও অধিকার ও সুরক্ষার প্রশ্নে তাঁরা এখনো অদৃশ্য।
গিগ ইকোনমির বিস্তার : ‘পার্টনার’ না ‘শ্রমিক’?

গিগ ওয়ার্কার বলতে এমন স্বাধীন বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বোঝায়, যাঁরা প্রথাগত দীর্ঘমেয়াদি চাকরির বদলে নির্দিষ্ট প্রোজেক্ট, কাজ বা ঘণ্টাভিত্তিক ছোট ছোট কাজে যুক্ত থাকেন। সাধারণত উবার, পাঠাও, ফুড পান্ডা কিংবা বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাঁরা কাজ করেন এবং নিজেদের সময় ও কাজের ধরন কিছুটা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারেন। তবে তাঁরা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণকালীন কর্মচারী নন। ফলে প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্য বীমা বা চাকরির স্থায়িত্বের মতো প্রচলিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। কাজের স্বাধীনতা থাকলেও এই শ্রেণির শ্রমিকদের জীবনে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিই বেশি।

ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন লাখো তরুণ। পুরান ঢাকার ওয়ারীতে ফুড ডেলিভারি রাইডার সাব্বির (ছদ্মনাম) বলেন, “আমাদের ‘পার্টনার’ বলা হয়। কিন্তু সবকিছু অ্যাপের ওপর নির্ভর করে। রেটিং কমলে কাজ কমে যায়, দুর্ঘটনা হলে নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়।”

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণা বলছে, গিগ শ্রমিকদের বড় অংশের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা নেই। তাঁদের আয় অনিশ্চিত এবং কাজের সময় দীর্ঘ।

শ্রম আইনের বাইরে ডিজিটাল শ্রম : বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এখনো মূলত প্রথাগত কর্মসংস্থানের জন্য প্রযোজ্য। গিগ বা ফ্রিল্যান্স কাজ এতে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়। ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ডিজিটাল শ্রমবাজার দ্রুত বাড়লেও আইনি কাঠামো সেই গতিতে আপডেট হয়নি। ফলে এই কর্মীরা অধিকারহীন অবস্থায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, ফ্রিল্যান্সার বা অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের নিজেদের কথা বলার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম নেই। দুর্ঘটনা বা ঝুঁকির ক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদেরই দায় বহন করতে হয়। তাই এই খাতের শ্রমিকদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। অধ্যাপক আকাশের মতে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন কাম্য নয়, তেমনি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীনতাও ঝুঁকিপূর্ণ। ‘একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগ পান না, অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সাররা পুরোপুরি স্বাধীন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে, যাতে কেউই বঞ্চিত বা স্বেচ্ছাচারী হয়ে না ওঠে।’ তিনি আরো বলেন, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুটি খাতকে আলাদা করে চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে। বৈষম্য দূর করে উভয়ের জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি এবং অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করাও জরুরি। আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গিগ ইকোনমির শ্রমিকরা বিশ্বজুড়েই অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ ও সীমিত সুরক্ষার মুখোমুখি। তবে বিশ্বজুড়ে গিগ ও ডিজিটাল শ্রমিকদের আইনি স্বীকৃতি বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গিগকর্মীদের ‘শ্রমিকের মতো অধিকার’ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতে ২০২০ সালের সামাজিক নিরাপত্তা কোডে গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো এই খাত আইনি কাঠামোর বাইরে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, গিগ ওয়ার্কারদের অন্তর্ভুক্ত করে নীতিমালা তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে, তবে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।

মানসিক চাপ ও নিঃসঙ্গতা : ডিজিটাল শ্রমের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। বিএফডিএসের তথ্য মতে, অনেক ফ্রিল্যান্সার প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। এতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া তরুণদের মধ্যে দ্রুত সফল হওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছে। ‘ভাইরাল’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ক্রিপ্টো বা অনলাইন ট্রেডিংয়ের ঝুঁকি, শর্টকাটে আয়ের প্রবণতা—এসব বিষয় তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে তাঁদের মধ্যে অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিশ্চিত আয় ও প্রতিযোগিতার কারণে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও চাপ বাড়ছে। ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘ডিজিটাল কাজ সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে পারফরম্যান্সের চাপ মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মতো কাজের ওপর যাঁরা নির্ভর করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা বেশি হচ্ছে। তাঁদের মনোযোগ কমে আসছে। সামাজিক আচরণের সমস্যাও হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Translate »
%d bloggers like this: