
রাজধানীতে নিয়মিত অভিযানে মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ বিভিন্ন ধরনের হাজার হাজার অপরাধীকে গ্রেপ্তার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু সংশোধন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, দ্রুত জামিনে মুক্তির সুযোগ, রাজনৈতিক প্রশ্রয়, চটকদার পরিচিতি পেয়ে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত তিন মাসে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানার পুলিশ বিভিন্ন অভিযানে ৬ হাজার ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তেজগাঁও বিভাগের মতো রাজধানীসহ সারাদেশে নিয়মিত অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হাজার হাজার গ্রেপ্তার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান জানান, গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ৬ হাজার ৮৮ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর এলাকা থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ১৯৬ জনকে। তিনি বলেন, তেজগাঁও বিভাগের আওতাধীন থানাগুলোতে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধীদের ধরতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
অপরাধীদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এসব অভিযান চলবে। পুলিশের দাবি, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও আগের তুলনায় এসব এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে গ্রেপ্তারের পর অপরাধীদের দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়া এবং আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচিতি প্রচারের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ‘ইতালিয়ান জুয়েল’-এর মতো চটকদার নামে পরিচিত করা হলে তাদের মধ্যে নায়কোচিত ভাব তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এসব নাম ও পরিচিতি অন্য কিশোর-তরুণদের অপরাধে আকৃষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলন ও গণমাধ্যমে তাদের উপাধি এবং দলীয় পরিচিতি প্রচার করা হলে অন্য কিশোরদের মধ্যে অপরাধীদের মতো ‘হিরো’ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। অপরাধীরা এসব পরিচিতি নিজেদের প্রভাব ও চাঁদাবাজির দাপট বাড়াতেও ব্যবহার করতে পারে।
তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী অপরাধীদের পরিচয় প্রকাশ করা যেতে পারে। তবে সবার ছবি ও অপরাধজগতের কথিত উপাধি প্রচার করা জরুরি নয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রচার যেন উল্টো অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়াতে সহায়তা না করে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমকে সতর্ক থাকতে হবে। ড. তৌহিদুল হক বলেন, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান সময়ে বেশ কঠিন। এ বয়সে অনেকের মধ্যে আবেগের আধিক্য থাকে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো চলতে চায় এবং অন্যের কথা সহজে বুঝতে চায় না। এ বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়াদের গ্রেপ্তারের পর কথিত উপাধিসহ প্রচার করা হলে অন্য কিশোর-তরুণদের কেউ কেউ তাদের হিরো মনে করতে পারে। সেই পরিচিতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেও কেউ অপরাধে জড়াতে পারে। অপরাধ অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি আরও বলেন, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ালে তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয়। কয়েক দিন কারাগারে থাকা ছাড়া কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না- এমন ধারণা তৈরি হলে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে।