
ছবিতে যাকে দেখছেন, তার নাম মোঃ আব্দুল্লাহ ইয়ামিন। নিষ্পাপ একটি মুখ, যে বয়সে মা-বাবার আদরে বড় হওয়ার কথা, সে আজ রয়েছে একটি এতিমখানায়—বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, অথচ অসম্ভব মায়াময়।
তার বাবা মারা গেছেন, মা তাকে রেখে চলে গেছেন এতিমখানায়। প্রায় দেড় মাস হলো, কেউ আর খোঁজও নেয় না। ছোট্ট আব্দুল্লাহর চোখে বুকভরা অপেক্ষা, আর মুখে চুপচাপ অভিমান।
১৬ই মে ২০২৫, সীতাকুণ্ড ব্লাড ব্যাংকের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি মানবিক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে দেখা। আমি যখন এতিমখানায় পৌঁছাই, ও আমার সামনে আসে। প্রথম দেখাতেই তার প্রতি অদ্ভুত এক মায়া অনুভব করি।
সে বয়সে যে ভালোবাসা, স্নেহ পাওয়ার কথা নিজের পরিবারের কাছ থেকে—সে ভালোবাসার ক্ষুধা যেন তার চোখে লুকানো। আমি নিজে তাকে খাওয়ার ব্যবস্থা করি। তার প্লেটে যখন একটু বেশি ভাত ছিল, অন্য একজনের প্লেটে কিছু দিই। পরে আরেক ছাত্র এসে তার প্লেট থেকে কিছু ভাত নিয়ে গেলে সে কেঁদে ফেলে।
আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে কোলে নিই, সান্ত্বনা দিই। একটু আদরেই সে হাসে—এই হাসিই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আসলে, তার প্রতি আমার এই আবেগ, এই টান—এটা শুধু মানবিকতা নয়, ব্যক্তিগত অনুভবও। কারণ, আমার একমাত্র কন্যা সন্তান ‘আরিশফা সরোয়ার ইকরা’র বয়সও প্রায় আব্দুল্লাহ ইয়ামিনের মতোই।
তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার ইকরা’র মুখই যেন ভেসে উঠছিল—যে প্রতিদিন আমার বুকে ঘুমায়, খেলে, আদর চায়। তাই আব্দুল্লাহকে দেখে যেন ইকরা’র প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেলাম—ফলে তাকে নিজের সন্তানের মতো করে কোলে নিই, আদর করি।
খাওয়ার পর তাকে কোলে দিই আমাদের সংগঠনের সদস্য, ছোট্ট এস. এম. রিয়াদ হোসেন-এর (যার বয়স সাড়ে তিন থেকে চার বছর)। রিয়াদের কোলেই আব্দুল্লাহ ঘুমিয়ে পড়ে—মায়ার পরশে নিশ্চিন্ত, নির্ভার।
রিয়াদ পরে বলে,
“আমি সাধারণত পাঁচ মিনিটও একভাবে বসে থাকতে পারি না। কিন্তু আজ প্রায় এক ঘণ্টা আব্দুল্লাহকে কোলে নিয়ে বসে ছিলাম, একটুও বিরক্ত লাগেনি। তার নিঃশব্দ ঘুম দেখে মনে হচ্ছিল, যেন আল্লাহর রহমত আমার কোলেই নেমে এসেছে।”
আমি তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকি অনেকক্ষণ—এই দৃশ্য আমাকে নাড়া দেয়। ভাবি, কত শত শিশু এভাবেই ভালোবাসার আশায় পথ চেয়ে থাকে, আর আমরা কতটা অজ্ঞ, উদাসীন!
প্রিয়নবী (সঃ) বলেছেন,
“তোমরা এতিমদের ধমক দিও না, কারণ আমিও এতিম ছিলাম।”
আল্লাহ বলেন—
“আমি কি তোমাকে এতিম অবস্থায় পায়নি?”
—
আসুন, এতিম শিশুদের জন্য একটু মমতা ছড়িয়ে দিই। একজন মানুষকে মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন ভালোবাসা ও স্নেহের—সেটাই যদি আমরা দিতে পারি, তাহলে এ পৃথিবীটা হয়ে উঠবে সত্যিই মানবিক।
চেয়ারম্যান, দিশারী যুব ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
অতিরিক্ত জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর, চট্টগ্রাম