September 12, 2026, 2:14 am

কর কর্মকর্তার সাড়ে ১৪ কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : Wednesday, March 11, 2026,
  • 199 Time View
Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক :
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর বিভাগের সহকারী কর কমিশনার মোসা. তানজিনা সাথী। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যার দায়িত্ব রাষ্ট্রের কর আদায় নিশ্চিত করা। কিন্তু কর আদায়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেই গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। সচেতনভাবে দুর্নীতির কালো টাকা আড়াল করতে ব্যবহার করেছেন নিজের জন্মদাতা বাবা ও গর্ভধারিণী মাকে।

তবে শেষ রক্ষা হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে আটকা পড়েছেন তিনিসহ তার পরিবার। নিজ ও তার বাবা-মার নামে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে মামলার আসামি হয়েছেন তারা। সম্পদ কম দেখিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতেই তিনি বৃদ্ধ বাবা-মাকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে ফাঁসালেন তাদের।

গত ১০ মার্চ দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। যেখানে তিন মামলার আসামি হয়েছেন কর কর্মকর্তা তানজিনা সাথী।

দুদকের অনুসন্ধানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তানজিনা সাথীর বাবা মোশারফ হোসেন মল্লিকের নামে ৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৫ টাকার সম্পদের দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। যার কোনো বৈধ উৎস দেখাতে পারেন নাই তিনি। একইভাবে তার মা রাণী বিলকিসের নামে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৬৩ টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ মিলেছে। দুদকের প্রতিবেদন বলছে, এই বৃদ্ধ দম্পতির নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস ছিল না, মূলত মেয়ের দুর্নীতির টাকা বৈধ করতেই তারা আয়কর নথিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আয়কর নথি মেয়ে তানজিনা সাথী তৈরি করেছেন দুর্নীতির টাকা আড়াল করতে।

বাবা-মায়ের পাশাপাশি নিজের নামেও কম সম্পদ করেননি এই কর কর্মকর্তা। রাজধানীসহ মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হদিস পেয়েছে দুদক। আর্থিক হিসাবে যার পরিমাণ ৫ কোটি ৬৬ হাজার ৯৪ টাকা। বিপরীতে বৈধ আয়ের কোনো প্রমাণ মেলেনি। সব মিলিয়ে এই পরিবারের মোট ১৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বেশি অবৈধ সম্পদের কারণে তানজিনা সাথী ও তার বাবা-মা দুদকের মামলার আসামি।

তিন মামলার এজাহার যা বলছে

সহকারী কর কমিশনার হিসাবে মোসা. তানজিনা সাথী কর অঞ্চল-৭ এর কর সার্কেল-১৩৭ ও ১৪২ এবং কর অঞ্চল-৯ এর কর সার্কেল-১৮১ কর্তব্যরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিপুল পরিমাণ উৎকোচ গ্রহণ করে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন এমন অভিযোগ নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানকালে তানজিনা সাথীর নামে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৬ টাকার সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেখানে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় আমলে নিলে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ কোটি ৭৯ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯২ টাকা। যার বিপরীতে তিনি ৭৯ লাখ ১৮ হাজার ২৯৮ টাকার সম্পদের পক্ষে দালিলিক প্রমাণ দেখাতে সমর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৫ কোটি ৬৫ হাজার ৯৪ টাকার। যে কারণে প্রথম মামলার আসামি হয়েছেন।

অন্যদিকে, তার বাবা মো. মোশারফ হোসেন মল্লিকের নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ ৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৫ টাকার সম্পদের প্রমাণ পায় দুদক। মূলত মেয়ে তানজিনা সাথী অবৈধ টাকাকে বৈধ করার লক্ষ্যে তার বাবার নাম ব্যবহার করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায় বাবা মো. মোশারফ হোসেন মল্লিকের নামে ৩ লাখ ২৯ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৪ হাজার ৪২ টাকার এবং অস্থাবর সম্পদ অর্থাৎ নগদ অর্থের প্রমাণ পায় দুদক। ২০০২-০৩ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে আয়কর নথিতে ব্যয় দেখিয়েছেন ৪ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৪ টাকা। সব মিলিয়ে ৮ কোটি ৯৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯৬ টাকার সম্পদের মধ্যে বৈধ উৎস দেখাতে পেরেছেন মাত্র ১ কোটি ৭ লাখ ১৯ হাজার ৪৪১ টাকা। বাকিটুকু জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বলে দুদক প্রমাণ পেয়েছে। আর ওই সম্পদ তার কন্যা তানজিনা সাথীর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকা বৈধ করার চেষ্টা করেছেন। এই মামলায় বাবার পাশাপাশি মেয়েকেও আসামি করা হয়েছে।

অনুরূপভাবে গৃহিণী মা মোসা. রাণী বিলকিসের নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৬৩ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। নিজের অবৈধ আয়কে বৈধ করার লক্ষ্যে তার মায়ের নামে ওই সম্পদ গড়ার অপরাধে মায়ের পাশাপাশি মেয়েকেও আসামি করা হয়েছে তৃতীয় মামলায়।

আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধি ১০৯ ধারায় মামলাগুলো দায়ের করে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Translate »