July 9, 2026, 5:44 pm

সীতাকুন্ডের আলোচিত ইরা হত্যা মামলায় বাবু শেখের মৃত্যুদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২৬,
  • 5 Time View
Spread the love

 

হত্যায় ফাঁসি, যাবজ্জীবন ও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, মোট আড়াই লাখ টাকা অর্থদণ্ড

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আট বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নাঈম ইরাকে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শ্বাসনালি কেটে হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় একমাত্র আসামি বাবু শেখ (৫০)-কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে মোট আড়াই লাখ টাকা অর্থদণ্ড, যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং পৃথক ধারায় আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বেলা ৩টায় চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) জান্নাতুল ফেরদৌস আলেয়া এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি বাবু শেখ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রায়ে আদালত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অপরাধে আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৭ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং একই আইনের ৯(৪)(খ) ধারায় ধর্ষণের চেষ্টার অপরাধে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। সব মিলিয়ে আদালত আসামির বিরুদ্ধে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেন।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আ ন ম কামরুল হাসনাত চৌধুরী। বাদীপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. সরোয়ার হোসাইন লাভলু ও অ্যাডভোকেট রিক্তা বড়ুয়া। আসামিপক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট বিবেকানন্দ চৌধুরী।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ১ মার্চ সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকায় ঘটে যাওয়া এ নৃশংস ঘটনার তদন্ত শেষে ১৫ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। ১৮ জুন আদালত অপহরণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও হত্যা ধারায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ভিকটিমের মা-বাবা, বড় বোন, চাচা, প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক, চিকিৎসক এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা। গত ৩০ জুন আসামির পরীক্ষা, ১ জুলাই আত্মপক্ষ সমর্থনে সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ২ জুলাই উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য ৯ জুলাই দিন ধার্য করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সরোয়ার হোসাইন লাভলু বলেন, “শিশু ইরার ওপর সংঘটিত অপরাধ ছিল অত্যন্ত নৃশংস ও মানবতাবিরোধী। রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ, ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামতের মাধ্যমে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন। আমরা মনে করি, এই রায় ভবিষ্যতে শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আ ন ম কামরুল হাসনাত চৌধুরী বলেন, “এই মামলায় প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, বৈজ্ঞানিক আলামত এবং আসামির বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণসমূহ অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। আদালত সেগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে ন্যায়সঙ্গত রায় দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে সন্তুষ্ট।”

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পুলিশ পরিদর্শক কামরুজ্জামান বলেন, “ঘটনার পরপরই আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করি। সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। আদালতের এই রায় আমাদের তদন্তের সঠিকতার স্বীকৃতি।”

নিহত ইরার মা, মামলার বাদী রোকেয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার মেয়েকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু যারা আমার মেয়ের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুরতা করবে, তাদের যেন একই পরিণতি হয়। আদালত যে বিচার করেছেন, তাতে আমি সন্তুষ্ট। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি, যেন আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়।”

ইরার চাচা মোহাম্মদ রমিজ আলী বলেন, “শুরু থেকেই আমরা ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করেছি। রাষ্ট্রপক্ষ, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং আদালত আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই রায়ে আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে।”

মামলার নথি অনুযায়ী, ঘটনার দিন বাবু শেখ ফুসলিয়ে ইরাকে চন্দ্রনাথ মন্দির সংলগ্ন পাহাড়ে নিয়ে যায়। মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজে শিশুটিকে নিয়ে তার পাহাড়ে ওঠার দৃশ্য ধারণ হয়। পরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ধর্ষণের চেষ্টা এবং শ্বাসনালি কেটে হত্যার ঘটনা স্বীকার করে। ঘটনার পরদিন কুমিরা ইউনিয়নের ছোট কুমিরা কাজীপাড়া এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় নিহত ইরার মা রোকেয়া বেগম সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করেন।

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত নিহত ইরার স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করে রায় ঘোষণাকে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Translate »
%d bloggers like this: