
দেউলিয়া বিষয়ক আদালত, চট্টগ্রাম ও অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১০ম আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আহমেদ সাইদের আদেশে জামিনের অপব্যবহারকারী দুই পলাতক আসামির কাছ থেকে বন্ডের অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ঘটনা চট্টগ্রাম আদালত অঙ্গনে ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, উক্ত মামলার দুইজন আসামি পূর্বে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হয়ে পলাতক হয়ে যান, যা ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৯ ও ৫১৪ অনুযায়ী বন্ড ভঙ্গের শামিল। পরে তারা গ্রেপ্তার হয়ে পুনরায় আদালতে হাজির করা হলে বিচারক আইন অনুযায়ী তাদের পূর্বে দেওয়া জামিন বন্ডের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশনা অনুসারে ৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দুই আসামির পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবীরা বন্ডের টাকা জমা দেন। এক আসামির পক্ষে অ্যাডভোকেট হারুনুর রশিদ রাজু ২০ হাজার টাকা এবং অপর আসামির পক্ষে ১০ হাজার টাকা, সর্বমোট ৩০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়।
আইন অনুযায়ী, CrPC-এর ধারা ৫১৪ অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা তার জামিনদার বন্ডের শর্ত ভঙ্গ করলে আদালত বন্ডে নির্ধারিত অর্থ জরিমানা হিসেবে আদায় করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে সম্পত্তি জব্দ ও নিলামের মাধ্যমেও সেই অর্থ আদায়ের ক্ষমতা রাখে।
এই বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি আইন কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু বলেন,
“ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫১৪ একেবারেই পরিষ্কার। জামিন আদালতের দেওয়া একটি আস্থা। আসামি সেই আস্থার অপব্যবহার করলে বন্ডের টাকা আদায় করা রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব। বিজ্ঞ বিচারকের এই আদেশের মাধ্যমে আইন শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে কার্যকর হয়েছে। এতে বিচারিক শৃঙ্খলা এবং আদালতের মর্যাদা আরও দৃঢ় হবে।”
তিনি বলেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমাবে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াবে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হারুনুর রশিদ রাজু, যিনি একজন আসামির পক্ষে ২০ হাজার টাকা বন্ড জমা দেন, তিনি বলেন,
“আইন সবার জন্য সমান। জামিন মানে দায়মুক্তি নয়, এটি শর্তসাপেক্ষ স্বাধীনতা। কেউ যদি সেই শর্ত ভঙ্গ করে, তাহলে আইন অনুযায়ী বন্ডের টাকা জমা দেওয়াই ন্যায়সংগত। আদালতের এই সিদ্ধান্ত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।”
আইন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম আদালতে দীর্ঘদিন ধরে জামিন বাতিল হলেও বন্ড আদায়ের বিধান নিয়মিতভাবে প্রয়োগ হতো না। ফলে জামিনের অপব্যবহার এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এই আদেশ সেই চর্চার বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই নজির ভবিষ্যতে শুধু দেউলিয়া বিষয়ক আদালতেই নয়, চট্টগ্রামের অন্যান্য ফৌজদারি আদালতেও জামিন ও বন্ড ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।