৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিনটি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার সংগ্রামের প্রতীক। একই সঙ্গে এটি সেইসব নারীদের স্মরণ করার দিন, যারা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক সংগ্রামী ও প্রভাবশালী নারীর নাম খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া ছিলেন দৃঢ় নেতৃত্ব, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। সাধারণ গৃহিণী থেকে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসার তার যাত্রা ছিল এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
একজন স্ত্রী হিসেবেও তার জীবন ছিল গৌরবময়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রপতি ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান–এর সহধর্মিণী। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ত সময়েও তিনি পরিবারের পাশে থেকে একজন আদর্শ স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। সেই সময় ধীরে ধীরে তিনি রাজনীতির অঙ্গনে এগিয়ে আসেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের আস্থাভাজন নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং বারবার গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। তবুও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে মোট তিনবার দেশের নেতৃত্ব দেন। একজন নারী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে তিনি বাংলাদেশের নারীদের জন্য নতুন আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার শাসনামলে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়, যা গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের অসংখ্য মেয়েকে বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দেয়। নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সংরক্ষিত নারী আসনের কার্যকর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন স্তরে নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। নারী উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তার সরকারের এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
একজন মা হিসেবেও তিনি সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। তার সন্তানদের মধ্যে অন্যতম জনাব তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের রাজনীতিতে তার নেতৃত্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত করে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা সংকট, মামলা, কারাবাস এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। এই সংগ্রামী মানসিকতা তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য নেত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
দীর্ঘদিন অসুস্থতাজনিত জটিলতায় ভোগার পর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ইন্তেকাল করেন। উনার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে এবং দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। দেশের কোটি কোটি মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উনাকে স্মরণ করেন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই দিনে আমরা তার সংগ্রামী জীবন, নেতৃত্ব ও নারীর ক্ষমতায়নে অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। মহান আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি, তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়ার সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। তার জীবন ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক:
অতিরিক্ত জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর, চট্টগ্রাম
সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ), জিয়া মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটি